এ.কে.এম সেলিম
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল বাকের। সরকারি থার্ড গ্রেডের অফিসার ও ৩ টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পিডির দায়িত্বে আছেন তিনি।
বাড়ি বেলাব উপজেলার সল্লাবাদ ইউনিয়নের সররাবাদ গ্রামে।তাঁর স্ত্রী সোনালী ব্যাংকের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। তারপরও ঢাকা শহরে নেই নিজের একটি বাড়ি। এলাকায় আসেন নিয়মিত। সদালাপী ও নিরহংকার স্বভাবের কারণে সকলের কাছেই প্রিয় তিনি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সাথে যোগাযোগ ও সকল ভালো কাজে সহযোগিতার মানসিকতার কারণে তরুণদের কাছে তিনি একজন সফল ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।
ইঞ্জিনিয়ার খায়রুল বাকের সম্পর্কে জানা যায়, ছাত্র জীবনে তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। প্রথম শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত তাঁর রোল ১ ছিল। ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ১০ম শ্রেনীতেও রোল ১ ছিল।১৯৮৪ সালে ৮ম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় নরসিংদী মহকুমার মধ্যে ১ম হয়ে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলেন তিনি।তখনকার সময়ে ক্লাস নাইনের ভাল ছাত্ররা স্কুলের যেকোন প্রোগ্রামের নেতৃত্ব দিত। তাই সে সময়ে ক্লাসের ফার্স্ট বয় হিসাবে ছাত্ররাজনীতির সকল প্রোগ্রামের নেতৃত্ব দিতেন এই বাকের।
১৯৮৬ সালে নারায়ণপুর সরাফত উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় হতে এসএসসিতে ১ম বিভাগ পেয়ে পাস করেন। ১৯৮৬ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েও হামিদ সাহেবের নির্দেশে নারায়ণপুর রাবেয়া মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এতে ১ম ব্যাচের ছাত্র হিসাবে হামিদ সাহেবের কলেজ হতে ১৯৮৮ সালে এইচএসসিতে একমাত্র ১ম বিভাগ পান তিনি। লোকমুখে শোনা যায় তিনি আবদুল হামিদ সাহেবের কত প্রিয় ছাত্র ছিলেন।
উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায়ও সফল হন তিনি। প্রথমে বুয়েটে মেটালার্জিকেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন বাকের।কিন্তু সাবজেক্ট পছন্দ না হওয়ায় পরবর্তীতে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে।
১৯৮৯ হতে ১৯৯৫ পর্যন্ত চুয়েটে তিনি শহীদ তারেক হুদা হলের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সেন্ট্রালের সহ-সভাপতি ছিলেন। তখন ছাত্রশিবির ও এনডিপির বহু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি। তার শরীরে সেসবের চিহ্ন এখনো আছে।
চুয়েটে থার্ড ইয়ার পর্যন্ত প্লেসধারী ছাত্র হলেও ছাত্রলীগের রাজনীতির কারণে পরীক্ষার পূর্বে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকায় প্লেস ছুটে যায়। তারপরও সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে ১ম বিভাগ পেয়ে পাস করেন এবং পরে উচ্চশিক্ষার স্কলারশীপ পেয়েও চাকরি করা জরুরী প্রয়োজন থাকায় বিদেশে পড়তে যাননি।

১৯৯৬ সাল থেকে প্রায় ২৫ বছর ইঞ্জিনিয়ারিং চাকুরী করছেন। সরকারী চাকুরীর আগ পর্যন্ত বিল্ডিং ডিজাইনের কনসাল্টিং ফার্মের ব্যবসা করেছেন তিনি। আরও ১০ বছর সরকারী চাকুরী করার বয়স আছে তাঁর। তার স্ত্রী সোনালী ব্যাংকে ১ম শ্রেণির পদে চাকুরীরত আছেন ২০০৪ সাল হতে। বর্তমানে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার পদে আছেন।
স্বামী-স্ত্রী ২০/২৫ বছর সরকারি চাকরী করেও ঢাকায় কোন বাড়ির মালিক হতে পারেননি এই দম্পতি। এখনো ৬ ভাইয়ের যৌথ সংসার তাদের। যা এই এলাকায় একটি উদাহরন হিসাবে আছে। চার দশক যাবত ঢাকায় তার ভাইদের কারখানার ব্যবসা আছে। প্রত্যেকেই মোটামুটি স্বচ্ছল। সদালাপী ও ঢাকায় অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত খায়রুল বাকের। নিজের ২টি সন্তানকেই ঢাকার সাধারণ বাংলা মিডিয়ামে পড়াচ্ছেন।
ঢাকায় একজন বিল্ডিং স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে সুপরিচিত। তবে অসবসর সময়ে আঞ্চলিক স্মৃতি ও জীবনী নিয়ে লেখালেখি করতে পছন্দ করেন তিনি। ২০১৮ সালে আবদুল হামিদ এম.এসসি সাহেবের জীবনী লিখেছেন, যা গত ৩০ বছরে কেউ করতে পারেনি।২০২০ সালে নরসিংদীর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও বই প্রকাশ করেছেন তিনি। এলাকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের নামে রাস্তার নামকরণ বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছেন; মুক্তিযুদ্ধের হারানো গৌরব সকলের সামনে তুলে ধরছেন।
ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে শত ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে হামিদ সাহেবের কলেজের গৌরব ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছেন প্রতিষ্ঠাতা আবদুল হামিদ সাহেবের এই প্রিয় ছাত্র।
বর্তমানে তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসাবে কর্মরত আছেন। সরকারি থার্ড গ্রেডের অফিসার ও ৩ টি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পিডির দায়িত্বে আছেন তিনি।
সর্বশেষ ০৩/১০/২০২০ তারিখে তাঁর শিক্ষাগুরু নারায়ণপুর আব্দুল হামিদ শিক্ষা কমপ্লেক্সের প্রতিষ্ঠাতা হামিদ সাহেবের কবর পাকা করে চিহ্নিত করেন। যা গত ৩৩ বছরেও কেউ করতে পারেনি।
বর্তমানে এলাকার নতুন প্রজন্মের স্বচ্চ মানুষদের কাছে ইঞ্জিনিয়ার খায়রুল বাকের একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। তরুণদের বক্তব্য- “অনেক ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার দেখেছি, তারা সুযোগ পেলেই ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমায়, কিন্তু বাকের সাহেব তা করেননি। তার মত এমন সাধারণ চলাফেরা কোন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারকে দেখিনি।”